
ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতা ও সহিংসতার মধ্যে উনিশ শতকের একটি সিটি হলে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। ফরাসি পুলিশের তথ্যমতে, গ্রেপ্তার ওই ব্যক্তি কট্টর বামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত ‘এস’ শ্রেণিভুক্ত এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অতীতে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলার রেকর্ড রয়েছে। গত শনিবার লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক ওই ভবনের ছাদ ও ঘড়ির মিনারে আগুন দেওয়ার ঘটনায় তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে তদন্তের স্বার্থে তাঁর নাম প্রকাশ করা হয়নি। গত শনিবার ফ্রান্সের মধ্যাঞ্চলীয় লিমোজ শহরের কারুকাজখচিত সিটি হলটির ঘড়ির মিনার ও ছাদের একাংশ আগুনে পুড়ে যায়।
দেশজুড়ে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকারি প্রসিকিউটরদের কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। তিনি স্পষ্ট করেছেন, পুলিশ কর্মকর্তা, আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য, অগ্নিনির্বাপণকর্মী বা সরকারি ভবনের ওপর হামলাকারীদের প্রতি কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে বিরোধীরা তীব্র সমালোচনা করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, কিন্তু প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সহিংসতা দমনে ফ্রান্সজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির দাবি উঠলেও বিচারমন্ত্রী তা নাকচ করে দিয়েছেন।
তাঁর মতে, এমন সিদ্ধান্ত নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংকুচিত করবে।
তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে লিমোজসহ মার্সেই, বোর্দো, নিস, লিওঁ ও লিলেসহ বিভিন্ন বড় শহরে সান্ধ্য আইন কার্যকর করা হয়েছে।
প্যারিসের প্লেস দে লা রিপাবলিক ও লেস হেলস শপিং এলাকার মতো সংবেদনশীল স্থানেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকরনু জানিয়েছেন, স্থানীয় মেয়রেরা সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সান্ধ্য আইনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানাবেন। সোমবার রাতে এসব পদক্ষেপের ফলে বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। লেকরনু বলেন, গতকাল সোমবার থেকে পুরো ফ্রান্সে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সান্ধ্য আইন জারি করার ফলে বিশৃঙ্খলা কমেছে। লেকরনু এই পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ কর্মকর্তা ও জেন্ডারমেসদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, মঙ্গলবার রাতেও সান্ধ্য আইন জারি করা হবে কি না, তা পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে লেকরনু লিখেছেন, ফরাসি অঞ্চলের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় মেয়ররা পরিস্থিতি ‘সরেজমিনে দেখে’ এসব সিদ্ধান্ত নেবেন। গতকাল রাতে দক্ষিণের শহর লিওঁর রাস্তাঘাট শান্ত ছিল।
পরিসংখ্যান বলছে, গত মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়নের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন বর্তমানে ব্যাপক রূপ নিয়েছে। এখন পর্যন্ত দুই হাজার ৫০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংঘর্ষে প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এছাড়া পুলিশের গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফ্রান্সের চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় দুই হাজারের বেশি দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্মকর্তারা গতকাল জানিয়েছেন, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির মতে, পুলিশের ব্যবহৃত গ্রেনেডের বিস্ফোরণে এক বিক্ষোভকারীর হাত উড়ে গেছে।
রাজধানী প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন শহরে মুখোশধারী ব্যক্তিদের গাড়ি ও সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। ট্রেড ইউনিয়নসহ বিভিন্ন প্রতিবাদী দল আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় বিক্ষোভকারীদের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত, তখন আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, আগামী শনিবার দেশজুড়ে দ্বিতীয় দফার বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হবে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য সরকারি সেবার মানের চরম অবনতির প্রতিবাদে লাখ লাখ আন্দোলনকারী রাজপথে নেমে আসেন। সপ্তাহান্তে আন্দোলনকারীরা এই এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন। ট্রেড ইউনিয়ন ও বিভিন্ন প্রতিবাদী দল যুক্ত হয়ে বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্যারিস, মার্সেই এবং অন্যান্য বড় ও ছোট শহরে মুখোশ ও কালো পোশাক পরিহিত ব্যক্তিদের গাড়ি ও ভবনে আগুন দিতে এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালাতে দেখা গেছে।
